প্রতিসরাঙ্ক

প্রতিসরাঙ্ক আসলে কী?

সংজ্ঞাঃ এক জোড়া নির্দিষ্ট মাধ্যম ও একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর তির্যকভাবে আপতনের ক্ষেত্রে, আপতন কোণের সাইন ও প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাত সর্বদা একটি ধ্রুব সংখ্যা। এ ধ্রুবককে ঐ নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর জন্য প্রথম মাধ্যম সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক বলে।

মনে করো, আলো এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে তির্যকভাবে (বাঁকা হয়ে) ঢুকছে। তখন আমরা দুটো কোণ পাই—একটা আপতন কোণ (i) আর একটা প্রতিসরণ কোণ (r)।

বিজ্ঞানী স্নেল বললেন, তুমি যদি আপতন কোণের সাইন (sini) আর প্রতিসরণ কোণের সাইন (sinr) কে ভাগ করো, তাহলে সবসময় একটা ফিক্সড সংখ্যা পাবে। এই ফিক্সড সংখ্যা বা ধ্রুবকটিকেই বলা হয় প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক। একে আমরা η (ইটা) দিয়ে লিখব।

গাণিতিকভাবে:

1η2=sinisinr

অর্থাৎ প্রতিফলনে যেমন আমরা দেখেছিলাম আপাতন কোণ আর প্রতিফলন কোণ সমান হয়, প্রতিসরণে তা হয় না। বরং তাদের কোণদুটির অনুপাত সমান হয়।

বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝি (সংখ্যার মানে কী?)

ধরো তোমাকে বলা হলো, "বায়ু সাপেক্ষে কাচের প্রতিসরাঙ্ক 1.5"। এই কথাটার মানে কী?

এর মানে হলো, আলো যখন বাতাস থেকে কাঁচে ঢুকবে, তখন আপতন কোণের সাইন (sini) আর প্রতিসরণ কোণের সাইন (sinr) এর অনুপাত বা ভাগফল ঠিক 1.5 হবে। সোজা কথায়, বাতাস থেকে কাঁচে ঢুকলে আলো কতটা তীব্রভাবে বাঁক নেবে, এই সংখ্যাটা (1.5) সেটাই নির্দেশ করে।

আবার প্রতিসরাঙ্ক যার যত বেশী সে তত বেশী ঘন।

প্রতিসরাঙ্কের কোনো একক নেই কেন?

এটা খুব ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন। খেয়াল করে দেখো, প্রতিসরাঙ্ক হলো দুটি একই জাতীয় রাশির (সাইন কোণ) অনুপাত। তাই এর কোনো একক (unit) থাকে না।

তবে মনে রাখবে, প্রতিসরাঙ্ক কিন্তু আলোর রঙের (তরঙ্গদৈর্ঘ্যের) ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ লাল আলোর জন্য কাচের প্রতিসরাঙ্ক যা হবে, বেগুনি আলোর জন্য তা একটু আলাদা হবে।

আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক (Relative Refractive Index)

যখন আমরা যেকোনো দুটো সাধারণ মাধ্যমের তুলনা করি (কেউই শূন্য মাধ্যম না), তখন সেটাকে বলে আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক।

ধরো, আলো a মাধ্যম থেকে b মাধ্যমে যাচ্ছে। তখন a মাধ্যমের সাপেক্ষে b মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ককে লেখা হয় এভাবে:

aηb

এখানে a হলো প্রথম মাধ্যম, আর b হলো দ্বিতীয় মাধ্যম।

পরম প্রতিসরাঙ্ক (Absolute Refractive Index)

আর যদি তুলনাটা শূন্য মাধ্যমের (Vacuum) সাথে হয়? মানে আলো শূন্য মাধ্যম থেকে কোনো একটা মাধ্যমে (ধরো x মাধ্যমে) ঢুকছে। তখন সেটাকে বলে পরম প্রতিসরাঙ্ক।

লিখবে কীভাবে?
শূন্য মাধ্যমের সাপেক্ষে x মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক হওয়ার কথা etax । কিন্তু শূন্য মাধ্যম বা ভ্যাকুয়াম তো স্ট্যান্ডার্ড, তাই বারবার 0 লেখার দরকার নেই। শর্টকাটে শুধু ηx লিখলেই সবাই বুঝে নেবে এটা পরম প্রতিসরাঙ্ক।

অর্থাৎ:
x এর পরম প্রতিসরাঙ্ক =ηx

বইয়ে দেওয়া কয়েকটা মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্কঃ

আপেক্ষিক ও পরম প্রতিসরাঙ্কের সম্পর্ক

আমরা আগেই জেনেছি, কোনো মাধ্যমের নিজের ক্ষমতা বা পরম প্রতিসরাঙ্ক হলো η। এখন যদি জানতে চাও, a মাধ্যমের সাপেক্ষে b মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (aηb) আসলে পরম প্রতিসরাঙ্কের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত, তাহলে নিচের সূত্রটা দেখো।

সূত্রটি হলো:

aηb=ηbηa

অর্থাৎ, a মাধ্যম সাপেক্ষে b মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক বের করতে হলে, দ্বিতীয় মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ককে প্রথম মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক দিয়ে ভাগ দিতে হবে।

মনে রাখার সহজ টেকনিক:
সূত্রটা খেয়াল করে দেখো—
ডানদিকের মাধ্যমটি (b) উঠে গেছে উপরে বা লবে।
বামদিকের মাধ্যমটি (a) নেমে গেছে নিচে বা হরে।

:::info
সোজা কথায়: "ডানেরটা উপরে, বামেরটা নিচে!"
:::

উদাহরণ:
যদি বলা হয় পানি (w) সাপেক্ষে কাচের (g) প্রতিসরাঙ্ক কত?

wηg=ηgηw

আলোর বেগের সাথে সম্পর্ক

প্রতিসরাঙ্কের সাথে আলোর বেগের সম্পর্কটা কিন্তু উল্টো। যে মাধ্যম যত বেশি ঘন (মানে প্রতিসরাঙ্ক η যত বেশি), সেই মাধ্যমে আলোর বেগ (c) তত কম। অনেকটা ভিড় রাস্তায় গাড়ির স্পিড কমে যাওয়ার মতো।

তাই বেগের ক্ষেত্রে সূত্রটা হবে উল্টো:

aηb=cacb

এখানে খেয়াল করো, a মাধ্যম (প্রথম মাধ্যম) উপরে আর b মাধ্যম (দ্বিতীয় মাধ্যম) নিচে।

একনজরে সব সূত্র:

যদি অংক করার সময় কনফিউশন লাগে, তাহলে শুধু এই একটা লাইন মনে রাখবে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে:

aηb=1bηa=ηbηa=cacb=sinisinr

ব্যাস! এই সম্পর্কটা মাথায় থাকলে প্রতিসরণের যেকোনো অংক তোমার কাছে ডাল-ভাত মনে হবে।

Demo Questions

৫। পানি ও কাচের পরম প্রতিসরাঙ্ক যথাক্রমে 4/3 ও 3/2 হলে পানি সাপেক্ষে কাচের আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক বের কর। ( 9/8 )

৬। বায়ু সাপেক্ষে পানির প্রতিসরাঙ্ক 4/3 । পানি সাপেক্ষে বায়ুর প্রতিসরাঙ্ক কত? ( 3/4 )

৭। পানি সাপেক্ষে কাচের প্রতিসরাঙ্ক 9/8 । বায়ু সাপেক্ষে কাচের প্রতিসরাঙ্ক 3/2 । বায়ু সাপেক্ষে পানির প্রতিসরাঙ্ক কত? (4/3)

৮। (ক) কেরোসিনের প্রতিসরাঙ্ক 1.44; হীরকের প্রতিসরাঙ্ক 2.42 হলে কেরোসিন সাপেক্ষে হীরকের প্রতিসরাঙ্ক কত? (1.68)
(খ) পানি সাপেক্ষে গ্লিসারিনের প্রতিসরাঙ্ক 1.1; পানি সাপেক্ষে হীরকের প্রতিসরাঙ্ক 1.82। গ্লিসারিন সাপেক্ষে হীরকের প্রতিসরাঙ্ক কত? (1.65)

৯। ইথানল এর প্রতিসরণাংক 1.37, পানির প্রতিসরণাংক 1.33 হলে; ইথানল সাপেক্ষে পানির প্রতিসরণাংক নির্ণয় কর। (0.971)

১০। রুবির প্রতিসরণাংক 1.54, জিরকনের প্রতিসরণাংক 1.92 হলে; রুবির সাপেক্ষে জিরকনের প্রতিসরণাংক নির্ণয় কর। (1.25)

১১। বেনজিন সাপেক্ষে হীরার প্রতিসরণাংক 1.61 হলে, হীরার সাপেক্ষে বেনজিনের প্রতিসরণাংক কত? (0.62)

১২। পানি থেকে আলো হীরকে 60° কোণে আপতিত হলে কত কোণে প্রতিসরিত হবে? পানি ও হীরকের প্রতিসরাঙ্ক যথাক্রমে 1.34 এবং 2.4। (28.91°)

১৩। বায়ু সাপেক্ষে পানির প্রতিসরাঙ্ক 1.33। আলো বায়ু হতে পানি প্রবেশের সময় আপাতন কোণ 45° হলে প্রতিসরণ কোণ কত হবে? (32.12°)

১৪। আলোক রশ্মি বায়ু থেকে বেনজিনে 30° কোণে আপতিত হলে কত কোণে প্রতিসৃত হবে? বেনজিনের প্রতিসরাঙ্ক 1.5 (19.47°)

১৫। পুকুরেরে মধ্যে অবস্থিত একটি আলোক উৎস হতে আলোক রশ্মি পানির উপরিতলে আপতিত হচ্ছে। প্রতিসরণ কোণ 40° হলে আপাতন কোণ কত? (পানির প্রতিসরাঙ্ক 1.33) (28.91°)

১৬। আলো পানি থেকে কাচে আপতিত হচ্ছে। আপাতন কোণ 45° হলে প্রতিসরণ কোণ কত? (ηw = 1.33; ηg = 1.52) (38.22°)

১৭। পানির প্রতিসরাঙ্ক 4/3 হলে পানিতে আলোর বেগ নির্ণয় কর। শূন্য স্থানে আলোর বেগ 3 × 10⁸ ms⁻¹। (2.25 × 10⁸ ms⁻¹)

১৮। পানির সাপেক্ষে বায়ুর প্রতিসরণাঙ্ক 0.75 হলে পানিতে আলোর বেগ কত? (2.25 × 10⁸ ms⁻¹)

১৯। গ্লিসারিনের সাপেক্ষে কাচের প্রতিসরণাংক 1.09। গ্লিসারিনে আলোর বেগ 2.04 × 10⁸ ms⁻¹ হলে কাচে আলোর বেগ নির্ণয় কর। (1.87 × 10⁸ ms⁻¹)

২০। a ও b মাধ্যমে আলোর বেগ যথাক্রমে 3 × 10⁸ ms⁻¹ ও 2 × 10⁸ ms⁻¹ হলে b মাধ্যমের সাপেক্ষে a মাধ্যমের প্রতিসরণাংক কত? (0.67)

২১। কাঁচ সাপেক্ষে হীরার প্রতিসরণাঙ্ক 1.59, কাঁচে আলোর বেগ 2 × 10⁸ ms⁻¹ হলে, হীরকে আলোর বেগ কত? (1.24 × 10⁸ ms⁻¹)

২২। কেরোসিনের প্রতিসরণাঙ্ক 1.44 হলে, কেরোসিনে আলোর বেগ নির্ণয় কর। (2.08 × 10⁸ ms⁻¹)
[📌 Hint: কারও সাপেক্ষে প্রতিসরণাঙ্ক না বললে বুঝে যাবা, এটি পরম প্রতিসরণাঙ্ক ; অর্থাৎ শূন্য মাধ্যমের সাপেক্ষে।
এই ধরণের ম্যাথ গুলা শূন্য মাধ্যমের সাথে তুলনা করে বের করবা, শূন্যস্থানের আলোর বেগের মান মুখস্থ রাখবা]

Powered by Forestry.md